রাষ্ট্র পুনর্গঠনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার থেকে পিছিয়ে আসা পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন
|সাজ্জাদ জহির |
|১৯ জুলাই ২০২৬ |
সম্প্রতি জুন-শেষে সংসদের বাজেট বক্তব্যে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট অনুধাবনের প্রয়োজন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অতীতের কোনো একপেশে ঐতিহ্যের মাঝে আটকে না থেকে আমাদের সামনের দিকে এগুতে হবে ঠিকই, তবে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা জনমনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল এবং গণ-অভ্যুত্থানকে ত্বরান্বিত করেছিল, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। এটি আশাব্যঞ্জক যে, মানুষ এখন ব্যাপকভাবে এটি উপলব্ধি করছে—ব্যক্তি মূলত একটি ব্যবস্থারই ফসল, আর সেই ব্যবস্থাটিই গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।
ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাগুলো বাস্তব হলেও, বিদেশি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট “জাতীয়তাবাদ” স্বৈরতন্ত্রকে উসকে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। জাতীয়তাবাদকে ফ্যাসিবাদী রূপ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজন সক্রিয় জাতি-গঠন প্রক্রিয়া; যেখানে রাষ্ট্র নাগরিকদের স্বার্থ সমুন্নত রাখবে, নিয়ম-ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে এবং স্বচ্ছ আইন কার্যকর করবে। এই নিবন্ধে অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাঠামোগত পর্যালোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি, যাতে প্রকৃত জাতি-গঠনের লক্ষ্যে জরুরি প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি-সংস্কারের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা যায়।
প্রাক-জুলাই বাংলাদেশে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যা নিম্নে সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করলাম।
পুঁজিবাজারে কারসাজি: প্রভাবশালী ও জবাবদিহিহীন মহলের নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে শেয়ারবাজারে সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সীমিত সঞ্চয় হারানোর বেদনা আজো অনেককে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
আবাসন খাতে দূর্বৃত্তায়ন: স্ব-মালিকানাধীন আবাসন প্রত্যাশী শহরবাসী এবং রেমিটেন্স প্রেরণকারী অনিবাসী বাংলাদেশীরা অসাধু ডেভেলপারদের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হয়েছেন। এসব অসাধু ডেভেলপার/বিল্ডারদের সাথে অনেকক্ষেত্রে হাত মিলিয়েছেন কর-বহির্ভূত অর্থের মালিক যারা তাদের ‘কালো টাকা’ কর-নথি-ভুক্তির বাইরে অনিবন্ধিত ভূমি ও আবাসন সম্পদ-বাজারে সচল রেখেছেন। আবার কেউ কেউ ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে –ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে যাওয়া ফ্ল্যাটের ‘পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি’ বা মালিকানা হস্তান্তরের আইনি ক্ষমতাকে জামানত হিসেবে ব্যবহার করে—ব্যাংক থেকে ঋণ হাতিয়ে নিয়েছে।
নিয়ন্ত্রণহীন আর্থিক স্কিম: নিয়ন্ত্রণহীন এমএলএম (MLM) সংস্থা, বহুমুখী সমবায় সমিতি এবং পঞ্জি স্কিমগুলোর মাধ্যমে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরা নিয়মিতভাবে প্রতারিত হয়ে আসছেন; আর এসব প্রতিষ্ঠান অর্থ আদান-প্রদানের জন্য অবাধে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করে থাকে।
দরিদ্র ও দুর্বলদের কাছ থেকে ধনী ও ক্ষমতাবানদের কাছে আর্থিক সম্পদ স্থানান্তরে ব্যাংকের ভূমিকা: রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের কারণে ব্যাংকের ভাণ্ডার যখনই শূন্য হয়ে পড়েছে, তখনই প্রতিটি সরকার তা পুনরায় পূরণ করেছে। এর ফলে সাধারণ নাগরিকদের ওপর করের বোঝা, বৈদেশিক ঋণের দায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যাংকিং কাঠামোর প্রতিটি স্তরে সুশাসনের অভাব: বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বিধিবদ্ধ রাখার (তদারকি করার) দায়িত্ব সাধারণত বিধি সংস্থা (বাংলাদেশ ব্যাংক)-এর উপর থাকে। তবে উভয়ের উপর এফআইডি-র মাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণ রয়ে গেছে। অতীতে দেখা গেছে, নজরদারী ও বিধিবদ্ধ রাখার পরিবর্তে, বিধি সংস্থা কর্তৃপক্ষ ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট স্বার্থে সৃষ্ট চাপ ও প্রলোভনের কাছে প্রায়শই নতিস্বীকার করেছে। সম্ভবত সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অধ্যাদেশের জটিল সমীকরণে গড়ে উঠা স্বার্থান্বেষী ‘শেয়ারহোল্ডার-মালিক’দের দৌরত্ব এবং আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষায় অপর্যাপ্ত ব্যবস্থার ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ব্যবস্থাপক ও চেয়ারম্যান পছন্দসই পর্ষদ নিয়ে অবাধ ক্ষমতা চর্চার সুযোগ পায়। যে রেগুলেটরি সংস্থা বিধিবদ্ধতার দেখভাল করবে এবং যে বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা সে দেখভাল করবে, তাদের কর্মীদের মধ্যকার বেতন ও দক্ষতায় পার্থক্য উল্লেখিত অসম সম্পর্কের কিছুটা ব্যাখ্যা দিতে পারে। এছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বিন্যাস সংক্রান্ত বিধিমালার অস্পষ্টতা বহিরাগত স্বার্থান্বেষী মহলকে ক্ষমতার অলিগলি ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত (বা বাধাগ্রস্ত) করার সুযোগ করে দেয়। এমন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যক্রমকে ‘প্রকল্প-ভিত্তিক’ (projectization) করার প্রবণতা স্পন্সর (পৃষ্ঠপোষক) ও বিদেশি ঋণদাতাদের জন্য ব্যাংকিং কার্যক্রমকে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে সাজানোর সুযোগ তৈরি করে দেয় — যা অনেক সময় ‘বৈশ্বিক সর্বোত্তম চর্চা’র (global best practices) অন্তরালে করা হয়। ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সমস্যার তাৎক্ষণিক চটজলদি সমাধান আশা করা যায়না। বৈশ্বিক অর্থবাজারের পরিবর্তনের ধারা-প্রকৃতি গুণতিতে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে গঠনমূলক পর্যালোচনা একান্তই জরুরী, যেখানে পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীল জবাবদিহিতামূলক শাসনকার্য গুরুত্ব পাবে।
নাগরিকত্ব, অভিবাসন ও নিবাস নির্ণয়ে অস্পষ্টতা: জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার সীমারেখা সুস্পষ্ট করা প্রয়োজন। নিবন্ধীকরণের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশে নিবাসী নাগরিক (দেশী), অনিবাসী বাংলাদেশী নাগরিক (যারা এনআরবি হিসেবে পরিচিত), স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে অবস্থানরত কর্মরত বিদেশী নাগরিক ও তাদের উপর নির্ভরশীল ব্যক্তি, এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক (ফরেন সিটিজেনস অফ বাংলাদেশ অরিজিন -FCBO)-দের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়না। জন্ম-নিবন্ধীকরণ, এবং ভোটার তালিকায় বা অভিবাসন দপ্তরে নিবন্ধীকরণের বাইরে, অনেক দেশে বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার নীতিমালার কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এই কাজটি সম্পাদন করা হয়। সেসবের অনুপস্থিতিতে দ্বৈত পরিচিতি-সম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রায়শই বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সম্পদ আহরণ করেন, অথচ কর প্রদানের ক্ষেত্রে নিজেদের দায়বদ্ধতা গোপন রাখেন। এই গোষ্ঠীটি প্রায়শই বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দায়বদ্ধহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অস্বচ্ছতা বিস্তৃত করেছে।
ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের বিষয়টি বৃহত্তর পরিসরে আলোচনার দাবী রাখে। সেটির বাইরে, উপরে উল্লেখিত সমস্যাগুলো তিনটি প্রধান দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়: সম্পত্তি বা আবাসন খাত ‘কালো টাকা’র বহুল-ব্যবহৃত আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত যেখানে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর ফাঁকির মাত্রা লক্ষণীয়; আর্থিক খাতে (উভয় শেয়ার বাজার ও ব্যাংক ব্যবস্থায়) কর ফাঁকি দেয়া অর্থ-সম্পদের অবাধ বিচরণ রয়েছে; এবং স্থায়ী নিবাস, বসবাসের অবস্থান ও নাগরিকত্বের তথ্য ট্র্যাক বা যাচাই করার জন্য জাতীয় নিবন্ধন-ভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্য-ভান্ডারের অনুপস্থিতিতে বর্ণচোরাদের আইন- ফাঁকির সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
সাম্প্রতিক বাজেট-বিষয়ক আলোচনার সময় এই দুর্বলতাগুলো মোকাবিলার লক্ষ্যে তিনটি গঠনমূলক নীতি-প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ সেগুলোকে বাতিল করে বা পাশ কাটিয়ে যায়। সে আলোচনা দিয়ে নবন্ধটি শেষ করবো।
১. আবাসন খাতের সম্পদ-মূল্যায়ণ ও কর সংস্কার কার্যক্রম বাতিলকরণ
বহুযুগ ধরে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কর ফাঁকি দেওয়া এবং বিপুল পরিমাণ কর-বহির্ভূত বা ‘কালো টাকা’র প্রবাহ বজায় রয়েছে। দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তির যে মূল্য দেখানো হয় তা যখন প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে কম হয়, তখন সরকার রাজস্ব হারায়; পাশাপাশি বিক্রেতারা অবৈধ আয়ের উৎস গোপন করেন এবং ক্রেতারা তাদের অর্থের উৎস প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকবার সুযোগ পায়। বাজার দামের চাইতে যথেষ্ট কম হওয়া সত্ত্বেও নীতিনির্ধারকরা সম্পত্তির সরকারি নিবন্ধনের মূল্যকে ‘মৌজা দর’-এর সাথে যুক্ত রাখার সিদ্ধান্তই বহাল রেখেছেন।
প্রত্যাশা ছিল যে, নতুন সরকার কালো টাকার বিস্তার রোধ, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে বাজারভিত্তিক সম্পত্তি মূল্যায়নের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রস্তাবটি বাতিল করা হয় এক ত্রুটিপূর্ণ অজুহাতে—যেখানে দাবি করা হয় যে, বাজারভিত্তিক মূল্যায়নের দিকে অগ্রসর হওয়া মানেই যেন অবৈধ অর্থ বা ‘কালো টাকা’র ‘স্ব-উদ্যোগে বিনিয়োগ’-কে প্রকারান্তরে বৈধতা দেওয়া! নিঃসন্দেহে, এই প্রক্রিয়ায় ‘কালো টাকা’কে নথি-বন্দী করতে হবে এবং সেকারণে ক্রেতা, বিক্রেতা ও রাজস্ব বিভাগের কাছে গ্রহণযোগ্য বন্দোবস্তে পৌছুতে হবে। সেটা না করে পিছু হটার ফলে বস্তুত আবাসন খাত থেকে উদ্ভূত অপসংস্কৃতি ও মিথ্যাচারের চল-কে স্বীকৃতি দেয়া হলো, এবং কালো টাকার আধিপত্য মেনে নিয়ে দুর্নীতিপরায়ণ মধ্যস্বত্বভোগীদের অসাধু কর্মকান্ডকে পরোক্ষ বৈধতা দেয়া হলো।
২. ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে টিআইএন (TIN) সংযুক্তকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা
দ্বিতীয় আশাব্যঞ্জক নীতি-পরিবর্তনের প্রস্তাবটি ছিল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সাথে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) সংযুক্ত করা, যা প্রধানমন্ত্রীর বাজেট ভাষণে বাতিল করা হয়। বিদেশী স্বার্থে নির্দেশিত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (এএমএল) কাঠামোর পেছনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সম্পদ ব্যয় করলেও, দেশের আমানতকারীদের সুরক্ষা প্রদানে আমরা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা তথ্য-নির্ভর ও অ্যালগরিদম-ভিত্তিক শাসনব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা করি; অথচ বলতে দ্বিধা নেই যে, অর্থের মত তথ্য বিদেশে পাচার হলেও মৌলিক আর্থিক তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর মতো কর্তৃপক্ষের নাগালের বাইরে রয়ে যায়।
আয়, বিনিয়োগ ও সম্পদের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত তথ্য-নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা নিঃসন্দেহে একটি কঠিন কাজ। তবে, একটি পরিমিত ও যৌক্তিক পদক্ষেপ হতে পারত কেবল নির্দিষ্ট সীমার (threshold) ওপরের ব্যাংক হিসাবগুলোর ক্ষেত্রে টিআইএন (TIN) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার বিধান রাখা। যেমন, ১০ লাখ টাকার বেশি স্থিতিসম্পন্ন হিসাব এবং যে হিসাবে ১ লাখ টাকার বেশি একক লেনদেন হয়। দুর্ভাগ্যবশত, কোনো নির্দিষ্ট সীমার উল্লেখ ছাড়াই প্রস্তাবিত আগের নীতিটি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্বল্প-বিত্তের আমানতকারীদের সুরক্ষার অজুহাতে বাতিল করা হয়েছে। পরিতাপের বিষয় হলো, TIN-ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংযুক্তির প্রস্তাবনা বাতিলের ফলে মূলত বিত্তবান অভিজাত শ্রেণিই সুরক্ষা পেল, যারা তাদের অপ্রদর্শিত করফাঁকি-দেয়া আয় সহ সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ গোপন রাখে। একইসাথে, শনাক্ত না হওয়ার ফলে বিদেশি কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী একাধিক নাগরিক-পরিচিতির ব্যক্তিরাও রাজস্ব বলয়ে অধরা রয়ে যাবে! সনদ-নির্ভর পরিচিতি যাচাইয়ের পরিবর্তে আমানত ও লেনদেনের সীমার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট হিসাবকে আওতামুক্ত রাখার নীতিসহ একটি সংশোধিত প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে, ‘কালো টাকা’র বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার পথে আমাদের সমাজ এগিয়ে যেতে পারে। সেইসাথে ব্যাংক খাতের অনেক অনিয়মও এই পদক্ষেপের ফলে হ্রাস পাবে। [সনদ-সংস্কৃত থেকে বেরুনোর আবশ্যিকতা সম্পর্কে ভিন্ন পরিসরে আলোচনা করা প্রয়োজন।]
৩. পরিচয়ের শ্রেণিবিন্যাস ও আর্থিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা
যথাযথ আর্থিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে আবাসন (residency) ও নাগরিকত্বের বিষয়টি কঠোরভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা প্রয়োজন। যেহেতু বাণিজ্যিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক লেনদেন পরিচালিত হয়, তাই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার যোগ্যতা নির্ণয়ে একজন ব্যক্তির আইনি আবাসন ও কর্মসংস্থান সংক্রান্ত অবস্থানের প্রতিফলন থাকা আবশ্যক। বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের অধিকার, স্থানীয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের সুযোগ এবং পেনশন বা অর্জিত অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের বিষয়ে সুষ্ঠ নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করার জন্য স্থানীয় বাসিন্দা ও অনিবাসী বাংলাদেশিদের (NRB) সাথে এফসিবিও (FCBO) ব্যক্তিদের পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি।
এই বিভাজনরেখাগুলো উপেক্ষা করার ঝুঁকি যে কতখানি তা নিকট অতীতের কিছু ঘটনাতে প্রতীয়মান হয়। বিশেষত বিদেশে নাগরিকত্ব নেয়া ব্যক্তিদের স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় ব্যাংকিং খাতের সংকটে গভীর সম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও এস. আলম পরিবার তাদের সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব এবং দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তির সুযোগ নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংকের আইসিএসআইডি (ICSID)-তে আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা দায়ের করেছে। আরও উল্লেখ্য যে, প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেণিবিন্যাস স্পষ্ট না থাকলে, ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা কঠোরতর বিধিনিষেধ আরোপের হাতিয়ার হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উপসংহার
জাতি গঠনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি সংস্কারের আলোচিত ক্ষেত্রগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি ভিত্তিতে বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করবার জন্য নীতি-নির্ধারক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই সংস্কার ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেকে সরে আসলে সাম্য ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে জাতিগঠন গঠনের উদ্যোগকে অংকুরেই বিনষ্ট হবে। সঠিক সময়ে সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করা না হলে আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন করতে পারব না এবং রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দুরাশাই রয়ে যাবে।
সাজ্জাদ জহির: নির্বাহী পরিচালক, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি)


